ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে কর অব্যাহতির পথ বন্ধ হচ্ছে। খাতির ও চাপের কাছে নতি স্বীকার করে নেয়া কর অব্যাহতির দিন আর থাকছে না। আগামী জুলাই থেকে কর অব্যাহতি দিতে পারবে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটির কাছে এ ক্ষমতা আর থাকছে না। গতকাল কর ব্যয় নীতিমালা এবং এর ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রকাশ করেছে এনবিআর। এতে বলা হয়েছে, কর অব্যাহতি দিতে সংসদের অনুমোদন লাগবে। এ নীতিমালা আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
নীতিমালায় বলা হয়, আয়কর আইন, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন এবং কাস্টমস আইনের মাধ্যমে এনবিআরকে দেয়া কর অব্যাহতির সব ক্ষমতা রহিত করা হবে। বার্ষিক জাতীয় বাজেট প্রণয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিভিন্ন কর আইনসংশ্লিষ্ট যেকোনো কর ব্যয় অনুমোদনের চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হবে জাতীয় সংসদ। সংসদ না থাকলে কর ব্যয়সংক্রান্ত বিধান জারির ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত থাকবে।
তবে বৃহত্তর জনস্বার্থে (নিত্যপণ্য ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ) অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টা জরুরি প্রয়োজনে মন্ত্রিপরিষদ বা উপদেষ্টা পরিষদের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে সাময়িক কর ব্যয় (অব্যাহতি) অনুমোদন করতে পারবেন বলে উল্লেখ করে নীতিমালায় বলা হয়েছে, এভাবে অনুমোদিত কোনো কর ব্যয় যে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে তার মেয়াদ কোনোক্রমেই জারির তারিখ থেকে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের শেষ দিনের অতিরিক্ত হবে না। কোনো কর ব্যয়কে যে অর্থবছরে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে ছাড় দেয়া হয়েছে, সে অর্থবছরের পরও ওই কর ব্যয় কার্যকর রাখতে হলে তা জাতীয় সংসদের মাধ্যমে অনুমোদিত হতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এতদিন বদনাম ছিল এনবিআর খাতির করে কর অব্যাহতি দিয়ে দেয়। যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করে, সে পরিমাণ অব্যাহতিও দিয়ে দেয়। এখন আর সেটি সম্ভব হবে না। সংসদের অনুমোদন লাগবে। আমরা চাই সব ধরনের কর ব্যয় (অব্যাহতি) বন্ধ হোক। এতে রাজস্ব আহরণ বাড়বে। সেসব অর্থ দেশের কল্যাণে ব্যয় করা যাবে।’
কর ব্যয় নীতিমালা এবং এর ব্যবস্থাপনা কাঠামোয় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা সত্তার নির্দিষ্ট আয়ের উৎসের বিপরীতে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য আইনের মাধ্যমে করছাড় দেয়া হলে সেই ব্যক্তি বা সত্তা পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো পদ্ধতিতে ওই নির্দিষ্ট আয়ের উৎসের বিপরীতে করছাড় প্রাপ্য হবেন না। এছাড়া ওই ব্যক্তি বা সত্তা যদি কোনো ধরনের একীভূতকরণ, বিভক্তিকরণ বা অধিগ্রহণের মাধ্যমে কাঠামোগত পরিবর্তন করেন, তাহলে তিনি বিদ্যমান করছাড় প্রাপ্য হবেন না। আন্তর্জাতিক কনভেনশন, দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি, করসংশ্লিষ্ট কোনো চুক্তি, দ্বৈত কর পরিহারসংক্রান্ত কোনো চুক্তির আওতায় অনুমোদিত করছাড়গুলো এবং কর আইনগুলো এ নীতিমালার ওপর প্রাধান্য পাবে।
এ নীতিমালার আওতায় কর ব্যয় বলতে বিদ্যমান কর আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান, যেমন এসআরও বা আদেশের মাধ্যমে প্রণীত বিভিন্ন আইনানুগ কার্যক্রমের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন কর, কাস্টমস ডিউটি, আয়কর ও আবগারি কর ব্যবস্থায় দেয়া সব করছাড়কে বোঝাবে। তবে আয়কর আইন, ২০২৩-এর আওতায় উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহ অগ্রিম আয়কর বিধায় ওই উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহের হারের হ্রাস বা বৃদ্ধি কর ব্যয়ের আওতাভুক্ত হবে না।
আইনগত ভিত্তির বিষয়ে বলা হয়েছে, কর ব্যয় নীতিমালা এবং এর ব্যবস্থাপনা কাঠামোর আইনানুগ বাস্তবায়নের জন্য সব কর ব্যয়সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো অর্থবিলের সঙ্গে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে। জাতীয় সংসদ কর ব্যয়গুলো অনুমোদনের পর যতদূর সম্ভব সংশ্লিষ্ট কর আইনগুলোয় তা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অনুচ্ছেদ ৪.১ (গ)-এর ক্ষেত্র ব্যতীত অন্য কোনো ক্ষেত্রে কেবল প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোনোরূপ কর ব্যয় অনুমোদন করা যাবে না। তবে এক্ষেত্রেও জাতীয় সংসদে অনুমোদিত কর ব্যয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিবিধানগুলোর জন্য পৃথকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করা যাবে।
প্রজ্ঞাপন বা আদেশের মাধ্যমে অনুমোদিত যেসব বিদ্যমান কর ব্যয়ের কোনো মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ নির্ধারিত নেই, সেসব কর ব্যয়সংশ্লিষ্ট সব প্রজ্ঞাপন বা আদেশ অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে জাতীয় সংসদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করতে হবে। জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্ত অনুসারে সেসব কর ব্যয় অনুমোদন, পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা রহিত করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টা ছাড়া অন্য কোনো মন্ত্রী, সরকারি কোনো দপ্তর বা সংস্থা, কর ব্যয়সংশ্লিষ্ট কোনো বিধান জাতীয় সংসদে অনুমোদনের লক্ষ্যে করসংশ্লিষ্ট বিল বা অর্থবিলে অন্তর্ভুক্তির উদ্দেশে আইনানুগভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবেন না। কোনো করছাড় সুবিধাকে ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকারিতা দেয়া হবে না।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টা জাতীয় সংসদে একটি বার্ষিক কর ব্যয় প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন। প্রতিবেদনে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কর ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণ এবং বিদ্যমান কর ব্যয়গুলোর মধ্যে প্রতি বছর কমপক্ষে এক-পঞ্চমাংশের ফলাফল মূল্যায়ন, যাতে প্রতিটি কর ব্যয়কে প্রতি পাঁচ বছরের মধ্যে কমপক্ষে একবার মূল্যায়ন করা হয় এবং তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়।
কোনো কর ব্যয় উপস্থাপন, সংশোধন, রহিতকরণ, পরিবর্ধন বা এর কাঠামো নির্ধারণের দায়িত্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত থাকবে। এভাবে প্রণীত কর ব্যয়গুলো সংশ্লিষ্ট আইনের মাধ্যমে অনুমোদনের জন্য অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টার মাধ্যমে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে।
এতে আরো বলা হয়েছে, কোনো করছাড় প্রস্তাব উত্থাপন, সংশোধন, পরিবর্ধন বা বাতিলের আগে অর্থমন্ত্রী কিংবা অর্থ উপদেষ্টা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। এছাড়া জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতি ও অন্যান্য নীতিগত বিষয়ের সঙ্গে কর ব্যয়গুলো যাতে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টা তদারক করবেন।
কর ব্যয় নীতিমালা কার্যকর হওয়ার পর নতুন করে কোনো কর সুবিধা সরকার কর্তৃক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে দেয়া হলে তার মেয়াদ ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ব্যতীত পাঁচ বছরের অধিক হবে না। তবে জনস্বার্থে জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনের মাধ্যমে অনির্দিষ্টকালের জন্য অব্যাহতি সুবিধা দেয়া যাবে।
সাধারণভাবে কোনো কর সুবিধাসংক্রান্ত বিধিবিধানে উল্লেখিত মেয়াদকাল বৃদ্ধিকে নিরুৎসাহিত করা হবে। তবে নির্দিষ্ট মেয়াদকালের পরেও কোনো কর সুবিধার মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজন হলে কর সুবিধার কার্যকর ফলাফল এবং কর ব্যয়ের পরিমাণ পর্যালোচনার ভিত্তিতে সময় বৃদ্ধির আইনানুগ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্ত থাকবে।
নীতিমালায় আরো বলা গয়, অর্থ মন্ত্রণালয় জাতীয় সংসদের কাছে বার্ষিক কর ব্যয় প্রতিবেদন উপস্থাপন করবে। কর ব্যয়ের কাঠামো নির্ধারণ, প্রাক্কলন ও পরিবীক্ষণের জন্য প্রতিটি কর ব্যয়সংশ্লিষ্ট কাঙ্ক্ষিত সীমা সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত হতে হবে; যাতে এ বেঞ্চমার্কের বিপরীতে পরিমাপকৃত বিচ্যুতিগুলো সংশোধনের ব্যবস্থা নেয়া যায়।